শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ

শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ কি

  • শিশুদের জন্মগতভাবে হৃদপিন্ডের গঠনগত কিংবা কর্মক্ষমতা জনিত যেকোন ত্রুটিকে শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ বলা হয়।
  • আমাদের দেশে লক্ষাধিক শিশু জন্মগত হৃদরোগে ভুগছে। কিন্ত বেশিরভাগ অবিভাবক এখনও এ বিষয়ে সচেতন নয়।
  • অবিভাবকদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সচেতনতা এবং সেই সাথে সঠিক সময়ে শিশু হৃদরোগ বিশেষঙ্গের শরণাপন্ন হওয়াই পারে শিশুর জীবন বিপন্ন হওয়া থেকে রক্ষা করতে।
  • আসুন আমরা শিশুদের জন্মগত হৃদরোগের কিছু জরুরি বিষয়ে আবগত হই।

জন্মগত হৃদরোগের ধরনসমূহঃ

  • এ্যাসায়ানোটিক- গোলাপী (যেখানে বাচ্চার চামড়ার রং স্বাভাবিক থাকবে)
  • সায়ানোটিক- নীল (যেখানে বাচ্চার চামড়া নীলচে বর্ণ ধারণ করবে)

এ্যাসায়ানোটিকঃ

  • এ্যাট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট (এএসডি)
  • ভেন্টিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট (ভিএসডি)
  • প্যাটেন্ট ডাক্টাস আটারিওসাস (পিডিএ)
  • পালমোনারি স্টেনোসিস (পিএস)
  • এ্যাওরটিক স্টেনোসিস (এএস)
  • কোয়ারটেশন অব এ্যাওরটা (সিওএ)

সায়ানোটিকঃ

  • ট্রেটোলজি অব ফেলর (টিওএফ)
  • ট্রান্সপজিশন অব গ্রেট আর্টারিজ (টিজিএ)
  • সিঙ্গেল ভেন্ট্রিক্যাল
  • ট্রাইকাস্পিড অ্যাটরেশিয়া

টোটাল এ্যানোমেলাস অব পালমোনারি ভেনাস রিটার্ন

  • ফাংশনাল হার্ট ডিজিজ
  • এ্যারিদমিয়া, কনজিনিটাল হার্ট ব্লক

কিভাবে শিশুদের হৃদরোগ নির্ণয় করা হয়?

  • মায়ের রোগ ইতিহাস/হিস্ট্রি
  • বাচ্চার রোগের ইতিহাস/হিস্ট্রি
  • বংশগত রোগের ইতিহাস/হিস্ট্রি

মায়ের রোগ ইতিহাস/হিস্ট্রি

  • গর্ভাবস্থায় মায়ের ইনফেকশন এর হিস্ট্রি
  • ভাইরাল ইনফেকশন (রুবেলা ভাইরাস)
  • ঔষধ এর হিস্ট্রি; যেমন- (এ্যান্টিকনভালসেন্ট, এসিইআই), এ্যালকোহল, সিগারেট
  • মায়ের ডায়বেটিস, উচ্চরক্তচাপ
  • মায়ের কানেক্টিভ টিস্যু ডিজিজ (এসএলই)
  • মায়ের জন্মগত হার্ট ডিজিজ এর হিস্ট্রি থাকে ১৫% ক্ষেত্রে

বাচ্চার জন্ম ও রোগের ইতিহাস/হিস্ট্রি

  • জন্মকালীন সময়ে বাচ্চার স্বল্প ওজন জনিত সমস্যা (আইইউজিআর)- যা গর্ভাবস্থায় বাচ্চার ইনফেকশন আর ফলে হয়ে থাকে।
  • জন্মকালীন সময়ে বাচ্চার অতিরিক্ত ওজন- যা মায়ের ডায়বেটিস নির্দেশ করে।

বংশগত রোগের ইতিহাস/হিস্ট্রি

  • মারফেন সিনড্রম
  • ন্যোনাস সিনড্রম
  • হ্লট-ওয়ারম সিনড্রম
  • কনজিনিট্যাল হার্ট ডিজিজ
  • বাত জ্বর
  • পারিবারিক ডায়বেটিস, রক্তনালীতে চর্বি জমা, উচ্চরক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি ইত্যাদি

বাচ্চার রোগের লক্ষনসমূহঃ

  • মায়ের দুধ খাবার সময় শিশু হাঁপিয়ে যায়, শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়
  • ঘুম কিমি. হয়, মেজাজ খিটখিটে থাকে
  • শরীর অতিরিক্ত ঘেমে যায়
  • খেলাধুলা বা খাবার সময় বুকের ছাতি ভেতরে দেবে যায়
  • ঘন ঘন ঠান্ডা কাশি হয় এবং এ কারনে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়
  • ওজন বাড়ছে না এবং বয়সের তুলনায় পরিপক্কতা কম হচ্ছে
  • মাঝে মাঝে ঠোঁট বা চামড়া গাঢ় নীল বর্ণ ধারণ করে এবং শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধি পায়
  • বুক ধরফর করে এবং খেলাধূলা করতে পারে না

অন্যান্য লক্ষনঃ

  • বুকে ব্যাথা
  • অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
  • বুক ধরফর করা
  • অস্থিসন্ধি ব্যাথা করা
  • স্ট্রোক

লক্ষনসমূহের কারনঃ

  • এই রোগে হৃদপিডের প্রকোষ্ঠগুলোর মাঝে ছিদ্র থাকে যারফলে ফুসফুসের ধমনীতে রক্তচাপ বেড়ে যায়।
  • এই উচ্চরক্তচাপ পালমোনারী হাইপারটেনশন সৃষ্টি করে যা হৃদপিন্ডকে সঠিকভাবে কাজ করতে বাঁধা দেয়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা সমূহঃ

  • চেস্ট এক্স-রে
  • ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG)
  • হলটার মনিটরিং
  • 2D, 3D এন্ড কালার ডপলার ইকোকার্ডিওগ্রাফি
  • ক্যাথ স্টাডি
  • কার্ডিয়াক সিটি, এমআরআই

ট্রিটমেন্টঃ

  • নন সারজিক্যাল
    • মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট
    • ডিভাইস ক্লোজার (যন্ত্রের সাহায্যে হৃদপিন্ডের আলিন্দ ও নিলয়ের জন্মগত ছিদ্র বন্ধ করা) অব ASD, VSD & PDA; বেলুন ভাল্বোপ্লাস্টির মাধ্যমে ধমনী ও শিরার সম্প্রসারণ (BPV, BAV, BAS)
    • পেসমেকার বসানো
  • কার্ডিয়াক সার্জারি

চ্যালেঞ্জ সমূহঃ

রোগনির্ণয় ও সিকিতসা জনিত চ্যালেঞ্জসমূহ:

  • রোগনির্ণয়ে দেরী হওয়া
  • সচেতনতার অভাবে দেরীতে ডাক্তারের কাছে আসা
  • শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতনতার আভাব
  • চিকিৎসার ব্যায় বহনে অসমর্থতা
  • রোগের লক্ষন প্রকোপ হলে হাসপাতালে ভর্তি হলে তারপর জন্মগত হৃদরোগ নির্ণয় হওয়া
  • শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ উপেক্ষিত থাকে, কেননা-
    • শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ ধরাপড়ার হার কুবি কম
    • লক্ষন সমূহ সাধারন নিউমোনিয়া, টিবি বা হাঁপানি হিসাবে চিকিৎসা পেয়ে থাকে
    • অবিভাবকদের পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং না করার ফলে একটি বদ্ধমূল ধারনা থাকে যে জন্মগত হৃদরোগ সম্পূর্ণ ভাবে নিরাময় হয় না।
    • এছাড়াও আমাদের দেশে চিকিৎসার ব্যায়, সকল সেন্টারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব এবং অপারেশন পরবর্তী পর্যাপ্ত ফলোআপের আভাব এ সেক্টরে অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে বিবেচিত।
  • করনীয় ………
    • শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ সম্পর্কে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা
    • প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ডাক্তার ও হেলথ প্রোভাইডার পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা-
      • উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে (শরীর নীলচে বর্ণ ধারণ করা কিংবা হার্টে মারমার শব্দ শুনতে পাওয়া) প্রাথমিক পর্যায়ে হৃদরোগ শনাক্তকরা
      • শনাক্ত করার পর রোগীকে দ্রুততম সময়ে শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের নিকট রেফার করা
    • যথাসময়ে উপযুক্ত পরীক্ষানিরীক্ষা ও রোগ নির্ণয় করা এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিকিৎসার ব্যাবস্থা করা আপনার শিশুর জীবন রক্ষায় গুরুত্তপূর্ণ ভূমিকা রাখবে
    • গাইনোকোলজিস্ট, শিশু বিশেষজ্ঞ, শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, কার্ডিয়াক সার্জন ও শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মীবাহিনীর উপযূক্ত প্রশিক্ষন ও টিমওয়ার্ক এই চিকিৎসা ব্যাবস্থার উন্নয়নে গূরুত্তপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে

    প্রতিরোধে করনীয়ঃ

    • গর্ভধারণের ৩ মাস পূর্বে মায়েদের রুবেলা ভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রদান
    • গর্ভকালীন সময়ে মায়েদের বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর ঔষধ সেবন থেকে বিরত থাকা
    • গর্ভাবস্থায় ডায়বেটিস ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখা
    • মায়েদের ফলিক এসিড যুক্ত খাবার গ্রহণ করা
    • রক্ত সম্পর্কে বিয়ে পরিহার করা
    • এবং দেরীতে গর্বধারণ পরিহার করা

    কি নোট/ মনে রাখুন………

    • জন্মগত শিশু হৃদরোগীরা কক্ষনই আমাদের জন্য বোঝা নয়
    • সময়মত চিকিৎসা দিলে তারাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করে
    • তারা আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ
    • আমাদের এখন জন্মগত হৃদরোগীদের উপযূক্ত চিকিৎসা দেবার সময় এবং সুযোগ রয়েছে

    আসুন আমাদের শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেই………